প্যান্টোগ্রাফ হলো চারটি দণ্ড জোড়া দিয়ে বানানো একটি যন্ত্র, যা দিয়ে কোনো নকশা হুবহু একই আকারে, বড় করে বা ছোট করে আঁকা যায়। কম্পিউটার আসার আগে জরিপকারী ও নকশাকাররা মৌজা ম্যাপের কোনো অংশ বড় করে দেখতে বা নতুন স্কেলে কপি করতে এই যন্ত্রই ব্যবহার করতেন। আজও অনেক সার্ভেয়ার ও আমিন প্যান্টোগ্রাফ চেনেন ও কাজে লাগান।
প্যান্টোগ্রাফ কীভাবে কাজ করে
প্যান্টোগ্রাফের দণ্ডগুলো একটি সামান্তরিকের (parallelogram) আকারে জোড়া থাকে। এতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু থাকে:
- স্থির পিভট — যেটি বোর্ডে আটকানো থাকে, যন্ত্রটি এর চারপাশে ঘোরে।
- ট্রেসার (কাঁটা) — যেটি দিয়ে মূল নকশার দাগের রেখা ধরে ধরে চালানো হয়।
- পেন্সিল/কলম — যেটি ট্রেসারের নড়াচড়া অনুসরণ করে নতুন কাগজে একই আকৃতি আঁকে।
দণ্ডের গায়ে ছিদ্র বা দাগ কাটা থাকে। কোন ছিদ্রে স্ক্রু বসানো হবে তার ওপর নির্ভর করে কপিটি কতগুণ বড় বা ছোট হবে। ট্রেসার মূল নকশায় চালালে পেন্সিল বড় কপি আঁকে; আর ট্রেসার ও পেন্সিলের জায়গা বদলে দিলে কপি ছোট হয়।
মৌজা ম্যাপে প্যান্টোগ্রাফের ব্যবহার
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মৌজা ম্যাপ ১৬ ইঞ্চি = ১ মাইল স্কেলে আঁকা, অর্থাৎ নকশার ১ ইঞ্চি মাটিতে ৩৩০ ফুট। ছোট দাগ এই স্কেলে খুব ছোট দেখায়, মাপ নিতেও কষ্ট হয়। তাই প্যান্টোগ্রাফ দিয়ে সাধারণত এসব কাজ করা হতো:
- নির্দিষ্ট দাগ বা কয়েকটি দাগের অংশ ২ গুণ (৩২ ইঞ্চি = ১ মাইল) বা ৪ গুণ (৬৪ ইঞ্চি = ১ মাইল) বড় করে আঁকা।
- জমি ভাগাভাগি বা বাটোয়ারার জন্য দাগের বড় কপি বানিয়ে তার ওপর ভাগের রেখা টানা।
- মামলা বা সালিশে দেখানোর জন্য বিরোধপূর্ণ অংশের স্পষ্ট বড় কপি তৈরি।
- পুরোনো, ছেঁড়া নকশার অংশ নতুন কাগজে একই স্কেলে কপি করা।
বড় করলে ক্ষেত্রফলের হিসাব কীভাবে বদলায়
এটিই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। নকশা ২ গুণ লম্বা করলে তার ক্ষেত্রফল হয় ৪ গুণ (২ × ২), আর ৪ গুণ লম্বা করলে ক্ষেত্রফল ১৬ গুণ। তাই বড় করা কপিতে মাপ নেওয়ার সময় অবশ্যই নতুন স্কেল ধরে হিসাব করতে হবে:
| নকশার স্কেল | ১ ইঞ্চি = মাটিতে | ১ বর্গইঞ্চি = জমি |
|---|---|---|
| ১৬ ইঞ্চি = ১ মাইল (মূল) | ৩৩০ ফুট | ২৫০ শতাংশ (২.৫ একর) |
| ৩২ ইঞ্চি = ১ মাইল (২ গুণ) | ১৬৫ ফুট | ৬২.৫ শতাংশ |
| ৬৪ ইঞ্চি = ১ মাইল (৪ গুণ) | ৮২.৫ ফুট | ১৫.৬২৫ শতাংশ |
প্যান্টোগ্রাফ ব্যবহারের ধাপ
- মূল নকশা ও সাদা কাগজ (বা ট্রেসিং পেপার) সমতল বোর্ডে শক্ত করে আটকান, যাতে নড়ে না যায়।
- যতগুণ বড় বা ছোট চান, দণ্ডের সেই অনুপাতের ছিদ্রে স্ক্রু বসান।
- স্থির পিভট বোর্ডে আটকান; ট্রেসার মূল নকশায়, পেন্সিল নতুন কাগজে রাখুন।
- দাগের সীমানা রেখা ধরে ট্রেসার ধীরে ও সমান গতিতে চালান — হাত কাঁপলে কপিতে ভুল আসে।
- কপির কোণে নতুন স্কেল (যেমন "৩২ ইঞ্চি = ১ মাইল") ও দাগ নম্বর লিখে রাখুন।
- শেষে মূল নকশা ও কপির একটি দূরত্ব মেপে মিলিয়ে নিন অনুপাত ঠিক আছে কি না।
প্যান্টোগ্রাফের সীমাবদ্ধতা
- যন্ত্রের জোড়া ঢিলা থাকলে বা হাত কাঁপলে রেখা বেঁকে যায়, ক্ষেত্রফলের হিসাবে ভুল আসে।
- মূল নকশায় যে অস্পষ্টতা বা ভুল আছে, বড় করলে সেটিও বড় হয় — নতুন তথ্য তৈরি হয় না।
- প্যান্টোগ্রাফে আঁকা কপি সরকারি সার্টিফাইড নকশা নয়; আইনি কাজে ভূমি অফিসের সার্টিফাইড কপি লাগবে।
আজকের দিনে বিকল্প: ডিজিটাল ফাইল
এখন বেশিরভাগ কাজ প্যান্টোগ্রাফ ছাড়াই করা যায়। মৌজা ম্যাপের স্ক্যান করা PDF/JPG ফাইল মোবাইল বা কম্পিউটারে জুম করে যেকোনো দাগ বড় করে দেখা যায়, আর প্রিন্ট রেডি ফাইল সঠিক মাপে প্রিন্ট করলে নকশার স্কেল ঠিক থাকে। দাগের ক্ষেত্রফল হিসাব করতে আমাদের জমি মাপার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন।
আপনার মৌজার নকশা খুঁজতে জেলাভিত্তিক মৌজা ম্যাপ পাতায় যান — কেনার আগে প্রিভিউ দেখে নিতে পারবেন। নকশা থেকে জমির পরিমাণ বের করার পুরো নিয়ম জানতে পড়ুন নকশা থেকে জমির পরিমাণ বের করার নিয়ম।
বিডি মৌজা







